যৌতুক নিরোধ আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী মামলা: অভিযোগ, শাস্তি ও করণীয়


বাংলাদেশে বিবাহ ও পারিবারিক জীবনে যৌতুক একটি সামাজিক ব্যাধি হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান। এ সমস্যা প্রতিরোধে সরকার যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮ প্রণয়ন করেছে। এর মধ্যে ৩ ধারা যৌতুক দাবি, প্রদান ও গ্রহণের বিরুদ্ধে কঠোর বিধান নির্ধারণ করে। এই আর্টিকেলে আমরা ধারা ৩ অনুযায়ী কোন কাজগুলো অপরাধ, কী শাস্তি হতে পারে এবং কিভাবে মামলা করা যায়—সেগুলো পরিষ্কারভাবে আলোচনা করব।


ধারা ৩ কী বলে?

যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮-এর ৩ ধারা অনুযায়ী—


যৌতুক দাবি করা,


যৌতুক প্রদান করা,


যৌতুক গ্রহণ করা,

এ—তিনটির যেকোনোটি করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।


শাস্তি

ধারা ৩ অনুযায়ী অপরাধ প্রমাণিত হলে—


➡️ সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড

অথবা

➡️ সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড

অথবা

➡️ উভয় দণ্ডই হতে পারে।


এটি জামিন অযোগ্য, সজ্ঞেয়, এবং অপরাধ বিজ্ঞ আদালতে বিচারযোগ্য।


যৌতুক দাবি কীভাবে প্রমাণিত হয়?

ধারা ৩-এর মামলায় সাধারণত নিচের বিষয়গুলো প্রমাণ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ—


মৌখিক বা লিখিত যৌতুক দাবি


মোবাইল কল রেকর্ড, মেসেজ, মেসেঞ্জার/হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট


সাক্ষীর জবানবন্দি


পারিবারিক নির্যাতনের ঘটনা


আর্থিক লেনদেন বা উপহার দেওয়ার প্রমাণ


যৌতুকের লেনদেন বা চাপ প্রয়োগের ঘটনা ঘটলেই এই ধারা প্রযোজ্য।


যৌতুক নিরোধ আইনের ৩ ধারায় মামলা কিভাবে করবেন?

১. থানায় অভিযোগ (FIR)

যদি আপনাকে, আপনার পরিবার বা কন্যাকে যৌতুকের জন্য চাপ দেওয়া হয়—


নিকটস্থ থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ (FIR) করতে পারবেন।


আইন অনুযায়ী এটি সজ্ঞেয় অপরাধ হওয়ায় পুলিশ সঙ্গে সঙ্গে তদন্ত শুরু করতে বাধ্য।


২. আদালতে সরাসরি মামলা

যদি পুলিশ অভিযোগ গ্রহণ না করে বা সঠিক ব্যবস্থা না নেয়—


সংশ্লিষ্ট মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সরাসরি মামলা দায়ের করা যায়।


৩. ডাইরি, মেডিকেল রিপোর্ট (যদি নির্যাতন থাকে)

যদি যৌতুকের সাথে নির্যাতন বা হামলার ঘটনা ঘটেছে—


মেডিকেল রিপোর্ট


সাধারণ ডায়েরি


নির্যাতনের ভিডিও/অডিও

এসব মামলাটিকে আরও শক্তিশালী করে।


মামলার প্রক্রিয়া

অভিযোগ দাখিল → FIR বা আদালতে মামলা


তদন্ত → পুলিশ সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করে


চার্জশিট → আদালতে দাখিল


বিচার → সাক্ষ্য গ্রহণ


রায় → দণ্ড বা অব্যাহতি


যদি দোষ প্রমাণিত হয়, আদালত ধারা ৩ অনুযায়ী দণ্ড প্রদান করে।


কোন পরিস্থিতিতে ধারা ৩ প্রয়োগ হবে?

ধারা ৩ সাধারণত প্রযোজ্য হয় যখন—


বিয়ের আগে বা পরে যৌতুক দাবি করা হয়


একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা/সোনা/পণ্য দিতে চাপ প্রয়োগ করা হয়


বিয়ের শর্ত হিসেবে যৌতুক দেওয়া হয়


স্বামী বা শ্বশুরবাড়ি যৌতুক না পেয়ে নির্যাতন করে


যৌতুক না দিলে বিয়ে ভেঙে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়


এগুলো আইন অনুযায়ী অপরাধ।


ভুল অভিযোগ দিলে কী হবে?

আইন যৌতুকের বিরুদ্ধে কঠোর হলেও মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ করলে আদালত শাস্তি দিতে পারে। তাই অভিযোগ করার সময় সব তথ্য-প্রমাণ ঠিকভাবে উপস্থাপন করা জরুরি।


উপসংহার

যৌতুক নিরোধ আইনের ৩ ধারা যৌতুক দাবি ও লেনদেনকে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে এবং এর শাস্তি কঠোর। তাই যৌতুক সংক্রান্ত যেকোনো নির্যাতন বা দাবি হলে দ্রুত পুলিশ বা আদালতের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। সচেতনতা বাড়ানো এবং আইনের সঠিক প্রয়োগই যৌতুকমুক্ত সমাজ গঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখবে।


এড. রাসেল বিশ্বাস 

01746-022550 

Comments

Popular posts from this blog

বাংলাদেশে কোর্ট ম্যারেজ: আইন, প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও খরচ